October 10, 2026, 10:48 am
বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর পথে থাকলেও সামনে রয়েছে নানা ঝুঁকি। চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। তবে একই সময়ে মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে ৯ শতাংশে উঠতে পারে। উচ্চ সুদহার, ঋণপ্রাপ্তিতে কঠিনতা, জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কাও রয়েছে।
এডিবির সর্বশেষ ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক সেপ্টেম্বর ২০২৬’-এ বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এসব পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। আর ২০২৬–২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও বেড়ে ৪ শতাংশে উঠতে পারে।
এডিবি বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় ২০২৫–২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কিছুটা কমেছে। তবে এর প্রভাব সীমিত থাকবে বলে মনে করছে সংস্থাটি। ২০২৬ সালের প্রথমভাগে জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে আসায় মানুষের ভোগব্যয় ও বিনিয়োগ বাড়তে পারে। এর ফলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও কিছুটা বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি।
এডিবির বাংলাদেশ প্রধান চিংফেং ঝাং বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ব্যবসার পরিবেশে সংস্কার দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। এসব সংস্কারের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শোভন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করে এডিবি। সংস্কার বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়েও সতর্ক করেছে এডিবি। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। তবে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে ৯ শতাংশে উঠতে পারে। জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জাহাজ চলাচলে সম্ভাব্য বিঘ্নকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে এল নিনোর প্রভাবে খাদ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। মুদ্রানীতি ধীরে ধীরে শিথিল করা হলে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে এডিবি।
আগামী অর্থবছরে দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতিও বাড়তে পারে। এডিবির হিসাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি ছিল জিডিপির শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে তা দ্বিগুণ হয়ে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি বাড়ার কারণেই এই ঘাটতি বাড়বে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেও রেমিট্যান্সের প্রবাহ ভালো থাকবে বলে আশা করছে এডিবি। প্রবাসী আয় বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হলে দেশের বৈদেশিক লেনদেনে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হবে। এ জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মুদ্রা বিনিময় হারকে বাজারের চাহিদা ও জোগানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে আগামী অর্থবছরে সেবা ও কৃষি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে এডিবি। তবে শিল্প ও বিনিয়োগ খাতের গতি তুলনামূলক কম থাকতে পারে। উচ্চ সুদহার, ঋণ পাওয়া কঠিন হওয়া, জ্বালানি সংকট এবং বিদেশে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে এসব খাতে চাপ থাকবে। এর সঙ্গে দেশের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলোও প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে থাকতে পারে। রেমিট্যান্সের কারণে মানুষের ভোগব্যয় বাড়তে পারে এবং সেটিই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি হয়ে উঠতে পারে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলে আরও বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে এডিবি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন বিধিনিষেধ, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, ডলারের বিপরীতে টাকার ওপর চাপ এবং ব্যাংক খাতে নতুন সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
এ ছাড়া রাজস্ব সংস্কারে বিলম্ব, উন্নয়ন ব্যয় প্রত্যাশার চেয়ে কম হওয়া এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছে এডিবি। এসব ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
এসআর